আমার এ লেখাটি কিছু জীবাণুবিদ আর তাদের বেড়াতে যাবার কাহিনী। জীবানু আর জীবানুদের প্রানরসায়ন নিয়ে আমরা যখন হাঁপিযে উঠেছি, ঠিক তখনই আমাদের এক কৃষ্ণবর্ণ, দীর্ঘাংদেহী সহকর্মী (যিনি সুযোগ পেলেই বিশ্ব ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন) ঠিক ক’রে ফেললেন সহকর্মীদের নিয়ে বেড়াতে যাবেন। শুরু হয়ে গেল তার জনসংযোগ। অনুরোধের ঝুলি নিয়ে ঘুরতে লাগলেন জনে জনে আর ব্যাখ্যা করতে লাগলেন তার ভ্রমন পরিকল্পনা (যদিও তার বেশির ভাগ পরিকল্পনাই সফলতার মুখ দেখে না)। পরিকল্পনার কথা শুনে কেউ বিমর্ষ হ’লেন, কেউ হ’লেন আনন্দিত আর কেউ কেউ ছোট-খাটো রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন (“খুবই উত্তম পরিকল্পনা”, “আপনি এগিয়ে যান, আমরা আপনার সাথে আছি”, “আপনি একাটা পরিকল্পনা করেছেন আর আমরা আপনার সাথে থাকবোনা, তা কি হয়?” ইত্যাদি ইত্যাদি)। যাই হোক, শুভ কাজে বোধহয় শুভাকাঙ্খির অভাব হয় না। যারা রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তারা ছাড়া আর মোটামুটি বাকি সবাই কথা রেখেছেন, রাজী হয়েছেন বেড়াতে যেতে। এত গেলো জনমত তৈরির কাজ, এবার অর্থনীতি, অর্থাৎ আয়-ব্যায়ের হিসাব। সেই কৃষ্ণবর্ন প্রধান আয়োজক যাকে আমরা এখন থেকে সোফা নামে জানবো। গোপণীয়তার স্বার্থে সকল ভ্রমনকারীর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হ’ল না। ভ্রমনকারী পাঠকদের সুবিধার্থে ছদ্দনাম গুলো প্রকৃত নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়েছে। পছন্দ না হ’লে নিজ গুনে ক্ষমা ক’রে দেবেন। সোফা ভাই পূর্বেই ঘোষনা ক’রে দিয়েছিলেন যে ভ্রমন খরচ মাত্র ২৫০৳ (পরে গোপন সূত্রে জানা গেছে এত কম খরচে বেড়ানোর ঘোষনা ছিল তার জনমত তৈরির একটি কৌশল মাত্র)।কিন্তু এত কম খরচেই কী আসলেই বেড়ানো সম্ভব? দেখা যাক কীভাবে আমারা সবাই মিলে একটি সাম্ভাব্য ভ্রম-কে সত্তিকারের ভ্রমনে রূপান্তরিত ক’রলাম। খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করার জন্যে দফায় দফায় বৈঠক হ’ল-পোলাও থেকে সাদা ভাত, মুরগীর রেজালা থেকে শাকপাতা, ইউসুফ বেকারীর কেক থেকে শুরু ক’রে আইপিএইচ ক্যান্টীন-এর (canteen) সিংগারা; কিছুই বাদ গেলনা আলোচনা থেকে। কিন্তু লাভ কী, জনপ্রতি চাঁদা মাত্র ২৫০৳। উপরওয়ালার দয়া হ’ল, উদয় হ’লেন মাহামুদি নামক আমাদের এক সহর্কমী (যিনি চাকরীর পাশাপাশি রেস্তোরার ব্যাবসা করেন)। তিনি স্বতপ্রণদিত হ’য়ে আমাদেরকে স্বল্পমূল্লে খাবার সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, আমাদের সোফা ভাইয়ের গায়ের রংও কিছুটা পূর্বাবস্থায় ফিরে এলো (মানসিক উত্তেজনার সময় ওনার গাত্রবর্ণ ক্রমশই অন্ধকারের দিকে যেতে থাকে)। এবার যাত্রার দিন-ক্ষণ ঠিক করার পালা। কিন্তু তার আগে তো যাত্রার বাহন আর গন্তব্য ঠিক করা চাই। আবার বৈঠক আহ্ববান করা হ’ল। নানা ঋষি, নানা মত। কেউ যেতে চায় থিম পার্কে, কেউ বা প্রকৃতির কাছে। শেষ অবধি সাব্যস্ত হ’ল ঢাকা শহরের অদূরে ভৈরবের কাছে মেঘনার পার-ই হবে আমাদের গন্তব্য। সব কিছুইতো হ’ল, শুধু বাকী রইলো যাত্রার বাহন। এ দায়ীত্বটি সোফা ভাই সাগ্রহে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। শুরু করলেন ঘোরাঘুরি, খোঁজ করতে লাগলেন কোথায় এবং কিভাবে সর্বনিম্ন মূল্লে গাড়ী ভাড়া পাওয়া যায়। ঢুঁ মারলেন সাম্ভাব্য সব জায়গায়, প্রানান্তকর চেষ্টা করলেন, কিন্তু এত সীমিত পরিমাণ অর্থে গাড়ী ভাড়া করা সত্যিই দু্রূহ। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে আর সেই সাথে সোফা ভাইয়ের গায়ের রঙও ফের ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছিলাম অবস্থা বেশী ভাল না, সোফা ভাই গাড়ীর ব্যাবস্থা করতে পারছেন না আবার মুখ ফুটে বলতেও পারছেন না। দিন পেরিয়ে রাত এসেছে, সকাল হ’লেই আমাদের যাত্রা শুরু হবার কথা। আমাদের কল্পনায় আমরা স্পষ্ট দেখতে পারছি- রাগে, দুঃখে সোফা ভাই নিজের চুল ছিরছেন আর এর ওর সাথে মুঠফোনে (mobile phone) কথা বলছেন, যদি শেষ রক্ষা হয়! ভাগ্য বিধাতা আবারও সদয় হ’লেন। এই ভ্রমন পরিকল্পনার একজন সক্রিয় উদ্যেক্তা হ’লেন মর্জিনা সুলতানা নাম্নী আমাদের এক সহর্কমী। সোফা ভাইয়ের এই করূন অবস্থায় তিনি সমব্যাথী। সাহায্য চাইলেন ওনার স্বামীর (দৈনিক আজাদ ভাই)কাছে। কাজের মানুষ আমাদের দৈনিক আজাদ ভাই, রাতের মধ্যেই গাড়ীর ব্যাবস্থা করে ফেললেন আর সেই সাথে সোফা ভাইয়ের গায়ের রঙও ফিরতে লাগল ধীরে ধীরে। এখানে উল্লেখ্য যে, দৈনিক আজাদ ভাই আমাদের সফর সংগী হয়েছিলেন এবং এই ভ্রমনের সফলতায় ওনার অবদান অপরিসীম। সবকিছুই প্রস্তুত, এখন শুধু অপেক্ষা সকাল হবার, তারপর-ই যাত্রা শুরু হবে শহর থেকে গ্রামের পথে, ভৈরবের কাছে, মেঘনার পারে।
সর্বসাকূল্যে আমরা বিশ থেকে পঁচিশ জন যাত্রী। সবাই বাংলাদেশী, শুধু একজন বাদে। সেই একজন বিদেশীনির নাম ইউনহা, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন এবং বাংলাদেশকে ভালবাসেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে সকাল আট ঘটিকার মধ্যে সবাই হাজির হয়ে গেলাম আমাদের মহাখালীতে অবস্থীত কার্যালয়ে। এমনিতেই ছুটির সকাল, তার উপর বেড়ানোর উচ্ছ্বাস। সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি। সবার মধ্যে একধরনের খুশীর আমেজ। একটু পরেই হাজির হ’ল আমাদের বাহন। বাহন দেখে সবাই কম-বেশী আহত হলেন, শূধুমাত্র সোফা ভাই আর দৈনিক আজাদ ভাই ছাড়া। বাহনটি ছিল ঢাকার রাস্তায় দোর্দন্ড প্রতাপে চলা “৩ নম্বর মিনিবাস”, হত্যা, হয়রানি আর বেপড়য়া চালচলনের জন্যে সে সর্বজন পরিচিত। সত্যিকথা বলতে কী আমরা একটু ভয়ই পেয়েছিলাম, কেননা আমাদের অনেকের সাথে আমাদের পরিবারের সদস্যরাও আমাদের সংগী হয়েছিলেন। আমাদের সবার মনের অবস্থা উপলব্ধী করতে পেরে সোফা ভাই একটা ছোট-খাটো “ভয় তাড়ানো” বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন; লাভের লাভ হ’ল আমরা আরো বেশী ভীত হয়ে পড়লাম। যাই হোক, মন যখন স্থীর করেছি, তখন আর পিছপা হওয়া চলে না। আল্লহ-র নামে সবাই উঠে পড়লাম। একনম্বর যাত্রী তিননম্বর বাস, শুরু হ’ল যাত্রা। ছুটির সকাল, রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা, তিননম্বর ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। আমরা সবাই গল্পে মত্ত আর সবার হাতে প্রাতঃরাশ ভর্তি ছোট্ট একাটা ঠোঙ্গা (packet)। হঠাত্ তীব্র একটা ঝাকুঁনি, থেমে গেল আমাদের তিননম্বর। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক মুর্তিমান ট্রাফিক কর্মকর্তা। আমাদের সবার মনের মধ্যে আবারও কাল মেঘেরা ভিড় করে এলো। এই বুঝি যাত্রার সমাপ্তি হয়, বাড়ী ফিরে যেতে হয় সবাইকে! আমাদের দেশের আইন-রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব-ই দূঃখজনক এবং তিক্ত। আমরা সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের অপরাধ গুরুতর। আমাদের গাড়ীটির ঢাকার বাহিরে যাবার ছাড়পত্র (license)ছিল না। কিন্তু এবারো দেবদূতের মত সামলে দিলেন আমাদের দৈনিক আজাদ ভাই। দর কষাকষি চললো কিছুক্ষন, তারপর ৫০০ টাকায় দফারফা। এরপর আমরা আবার ছুটতে শুরু করলাম।“ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়”, বাকী যাত্রায় সোফা ভাইকে দেখে বারে বারে আমার এই কথাটিই মনে পড়ছিল, কেননা যতবার উনি গাড়ীর জানালা দিয়ে কোন ট্রাফিক ভাইকে দেখছিলেন, ততবারই ওনার মুখ-চোখ শুকিয়ে যাচ্ছিল।
অবশেষে সব বাধা পেড়িয়ে বেলা বার’টা নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে, মেঘনার পারে। হল্লা ক’রে সবাই নেমে এলাম গাড়ী থেকে, কেউ কেউ আনন্দে আত্বহারা। আমি হলফ করে বলতে পারি, যারা অহরহ বেড়াতে যান, তাদের কাছে মেঘনার পারে বেড়াতে গিয়ে আনন্দে আত্বহারা হ’য়ে যাওয়া আদিক্ষেতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অন্য সবার কথা জানিনা, কিন্তু আমার কাছে এই মেঘনার পারে বেড়াতে আসার ব্যাপারটি ছিল অপার আনন্দের। এমনিতেই নদীর পারে খুব বাতাস বয়, সেদিন যেন একটু বেশী জোরেই বৈ ছিল। হতে পারে এভাবেই নদী নতূণ অতিথীদের তার পারে অভ্যর্থণা জানায়। মেঘনার যে পারে আমরা গিয়েছিলাম সেটা ছিল “মেঘনা সেতু”-র একদম-ই কাছে। সম্ভবত সেতুর প্রয়োজনেই এই পারটি বড় বড় পাথর দিয়ে বাঁধানো। সেই বড় বড় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার পালা, সুন্দরকে ফ্রেমে বন্ধি করার খেলা। সবার সাথে আমিও খেললাম; বসে, দাঁড়িয়ে, পাথরকে জড়িয়ে ধরে অনেক ভাবে ছবি তুললাম এবং একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। অনেক্ষন ধরে সোফা ভাই-কে দেখা যাচ্ছে না। একটু দূরে নির্জনে তাকে পেলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুমপাণ করছেন আর মুগ্ধ চোখে “মেঘনা”-র দিকে তাকিয়ে আছেন। সোফা ভাই “মেঘনা”-র প্রেমে পড়ে গেলেন না-কি? জুমি ভাবীর (ওনার স্ত্রী) জন্যে আমার মন খারপ হল। দৌড়ে ওনার কাছে এলাম, আমাকে দেখে সোফা ভাই বাস্তবে ফিরে এলেন। আমার দিকে একটা তামাকদন্ড (cigarette) বাড়িয়ে দিয়ে নিজের মনেই ব’লে উঠলেন, “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিষির বিন্দু”; তারপর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস। বুঝলাম উনি “মেঘনা”-র প্রেমে পড়েননি, পড়েছেন মেঘনা নদীর প্রেমে। আমিও আশ্বস্ত হলাম।
একাকীত্ব ছেড়ে দুজনেই ফিরে এলাম ছবি তোলায় ব্যাস্ত সংগীদের কাছে। সংগীদের মাঝে একটা কোলাহল শুনতে পেলাম “নৌকায় চড়বো”, “নৌকায় চড়বো”। সবাই নৌকায় চড়বার বায়না ধরেছে। এটা আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না, তাই এই খাতে কোন অর্থও বরাদ্ধ নেই। অন্যদিকে, আমাদের অধিকাংশই সাঁতার জানতাম না (আমিও তাদের মধ্যে একজন)। কিন্তু নদীর বুকে ছোট-বড় নৌকাগুলো কে ভাসতে দেখে, নৌকা ভ্রমনের ইচ্ছাটা সম্বরণ করা সত্যিই কষ্টকর হয়ে দাড়ালো। শেষ অবধি ইচ্ছারই জয় হ’ল। যন্ত্রচালিত একাট মাঝাড়ি আকারের বজরা ভাড়া করা হ’ল। সবাই মিলে সেই বজরায় চরে বসলাম। কেউ বসলো ছাতে, কেউ বসলো পাটাতনে। আনন্দে উদ্বেল হয়ে আমরা হাওয়া খেতে লাগলাম আর যতদুর চোখ যায় দেখতে লাগলাম। কাছাকাছি একটা চর দেখতে পেয়ে, ঠিক হ’ল চরে নামা হবে। এই ফাঁকে আপনাদের একটা মজার তথ্য দিয়ে রাখি। সোফা ভাই সাঁতার জানতেন না আর তাই নৌকা ভ্রমনের ব্যাপারে কিছুটা গররাজী ছিলেন। কিন্তু বজরা ভাড়া করার পরে উনি উঠে বসলেন বজরার ছাতে। শুধু তাই নয়, আমাদের সেই বিদেশীনি ভ্রমন সংগীকেও তার সাথে ছাতে উঠে বসবার জন্যে উদবুদ্ধ করে ফেললেন। তারপর আর কী, সেই ছোট চোখের বিদেশীনির সাথে ওনার গল্পের ঝুড়ি (শতভাগ গল্পই ঢাঁহা মিথ্যা)খুলে বসলেন আর বজরার পাটাতনে ব’সে তার ছোট নাকের স্ত্রী করুণ চোখে তাদের দেখতে লাগলেন। বাস্তব সত্যিই নির্মম! যাই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি। চরে নামার পর, আরেক দফা ছবি পর্ব (Photo session)। ছোট্ট চর, চারিদিকে মেঘনা। তিন-চার ঘর পরিবারের বসবাস এই চরে। ওই সব পরিবারের ছোট ছোট বিবস্ত্র শিশুরা আমাদেরকে বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগল। এরকম অবস্থায় নিজেকে সাধারণত একটু অন্যরকম মনে হয়। মনে হয় “আচ্ছা, আমি তাহলে দেখার মত একটা জিনিস”। আমার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। নিজের অজান্তেই এই বিবস্ত্র শিশুদের বিস্মিত দৃষ্টি নিজেকে একটু বড় ভাবতে সমর্থন জুগিয়েছে। কিন্তু পরক্ষনেই লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে, কেননা আমি তাদের বিস্ময়ের আসল কারনটি বুঝতে পেরেছিলাম। তারা বিস্মিত এই ভেবে যে, এরাও মানুষ, আমারাও মানুষ; এরাও বাংলাদেশী, আমারাও বাংলাদেশী; এরাও বাংলায় কথা বলে, আমারাও বাংলায় কথা বলি। তাহলে এদের গায়ে এত রঙ্গীণ পোশাক আরে আমরা বিবস্ত্র কেন? এর উত্তর আমার জানা নেই অথবা জেনেও না জানার ভান করছি। তবে একথা সত্যি যে চরের বাকী সময়টুকু আমি ঐ শিশুদের চোখে চোখ রাখতে পারিনি। এ লজ্জা আমার একার নয়, আমরা যারা সৌভাগ্যবান, ভাল খাই, ভাল পরিধান করি তাদের সবার।
মনে কষ্ট আর এক পেট ক্ষুধা নিয়ে আবার বজরায় চরে বসলাম। একসময় আমাদের বজরা পারে ভিড়ল, আমরাও নেমে পরলাম। সেতুর নীচেই সরাকারি ব্যাবস্থাপনায় সুন্দর একাটি উদ্যাণ গড়ে তোলা হয়েছে। সারি সারি গাছ আর মাটিতে নরম সবুজ ঘাস, একটা মনোরম ব্যাবস্থা। বসবার জন্যে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই সংগে করে বিছানার চাদর নিয়ে এসেছিলেন। সেই চাদর বিছিয়ে সবাই মিলে সেখানেই খেতে বসে গেলাম। সবার খাবার গতি দেখে ক্ষুদার ঝাঁজ আঁচ করা যাচ্ছিল। দুপুরের খাদ্য তালিকায় ছিল মোরগ পোলাও, সব্জি আর কোমল পানীয়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খাবার গুলো ঠান্ডা হয়ে বিস্বাদ লাগছিল, তারপরেও সবাই খাচ্ছিলাম বুভূক্ষের মত। আমাদের এক বয়োজেষ্ঠ সহকর্মী, মেরুন আপা খাচ্ছিলেন বাঁ হাত দিয়ে কেননা ওনার ডান হাতের আঙ্গুলে পটি (Bandage) বাঁধা। আমাদের বাঁ হাত যেহেতু একাটা বিশেষ কাজের জন্যে সংরক্ষিত থাকে, তাই সবাই একটু অস্বস্থি নিয়ে আড়চোখে ওনার খাওয়া দেখছিলেন। এরমাঝেই উনি একটা সর্বনাশ করে ফেললেন। নিজের ভাগের এক টুকরো মুরগীর মাংস ওনার সেই “বাঁ হাত” দিয়ে তুলে দিলেন সোফা ভাইয়ের প্লেটে। মূহুর্তের জন্যে সবার খাওয়া থেমে গেল। সবার দৃষ্টি সোফা ভাইয়ের পাতে। বেচারা সোফা ভাই, “না পারি সইতে, না পারি কৈতে” অবস্থা। একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন, একবার ওর দিকে তাকাচ্ছেন। এক সময় নিঠুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলেন।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গেল খুব দ্রুত। এরপর কেউ কেউ আলস্যে শরীর এলিয়ে দিলেন মাটিতে পাতা চাদরে আর কেউ চলে গেলেন মেঘনা সেতু দেখতে। সেতুর উপর আরেক দফা ছবি তোলা চলল। এবার ফেরার পালা। সবাই আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম। দৈনিক আজাদ ভাই জানালেন ফিরতি পথে পাহারের টিলায় একটা সুটিং স্পট আছে, চাইলে ঘুরে যেতে পারি। সবাই রাজী “কেয়া কারেগা কাজী”। দৈনিক আজাদ ভাইয়ের নির্দেশে এক জায়গায় এসে গারী থামল, আমার নেমে পরলাম। এখান থেকে শুটিং স্পটের দূরত্ব হাঁটা পথ। কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছে গেলাম। কিন্তু ছুটির দিন, তাই শুটিং স্পটের (Shooting spot) প্রধান ফটকে তালা। তারপরও আমাদের ভেতরে ঢোকার সৌভাগ্য হয়েছিল, তবে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, সে গল্প আরেক দিন করা যাবে। স্পট দেখে ফের গাড়ীতে উঠে বসলাম। আকাশে মেঘ করেছে, ঠান্ডা বাতাস বইছে। দু’পাশে সারি সারি টিলা, আমাদের তিন নম্বর ছুটে চলেছে ফিরতি পথে। ঘন্টাখানিক পরে চা পানের জন্যে আবার যাত্রা বিরতি হ’ল। চা পর্ব অর্থায়ন করলেন দৈনিক আজাদ ভাই। সবাই যখন চা পানে ব্যস্ত, হটাত খেয়াল হ’ল আমাদের একজন সহর্কমী, লাক্ষা বেগম, চা পর্বে অনূপস্থিত। আমরা ক’জন ছুটে গেলাম তার খোঁজে, তাকে পাওয়া গেল গাড়ীতে। এতক্ষন দেখছিলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, এখন দেখি গাড়ী ভেতরেও বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাত লাক্ষা বেগম কাঁদছেন। কান্নার কী কারণ? দয়া করে কেউ হাসবেন না, কান্নার কারণ “স্বামীর লাইগ্যা মন পুড়তাছে”। প্রসঙ্গত, ওনার স্বামী এই ভ্রমনে অংশগ্রহন করতে পারেননি।
লাক্ষা বেগমের দুঃখে দুঃখিত হ’য়ে আমাদের চা পর্ব সংক্ষিপ্ত ক’রে আমরা ফের রওনা হ’য়ে গেলাম ঢাকার পথে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের তিন নম্বর আমাদেরকে নিরাপদে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিয়ে গেল। এরপর সবাইকে আল্লহ হাফেয জানিয়ে, মেঘনার পারকে পেছনে ফেলে যার যার মত রওনা হয়ে গেলাম বাড়ীর পথে। কিন্তু আমার কেন জানি বার বার-ই মনে হচ্ছিল, কে যেন আমার পেছন পেছন আসছে, মেঘনা না তো? আমার কানে কানে যেন কিছু বলছে। বোঝা যাচ্ছে না, খুব অস্পষ্ট। কেমন যেন কবিতার মত শোনাচ্ছে........................
আবার এসো আমার পারে,
সর্বসাকূল্যে আমরা বিশ থেকে পঁচিশ জন যাত্রী। সবাই বাংলাদেশী, শুধু একজন বাদে। সেই একজন বিদেশীনির নাম ইউনহা, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন এবং বাংলাদেশকে ভালবাসেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে সকাল আট ঘটিকার মধ্যে সবাই হাজির হয়ে গেলাম আমাদের মহাখালীতে অবস্থীত কার্যালয়ে। এমনিতেই ছুটির সকাল, তার উপর বেড়ানোর উচ্ছ্বাস। সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি। সবার মধ্যে একধরনের খুশীর আমেজ। একটু পরেই হাজির হ’ল আমাদের বাহন। বাহন দেখে সবাই কম-বেশী আহত হলেন, শূধুমাত্র সোফা ভাই আর দৈনিক আজাদ ভাই ছাড়া। বাহনটি ছিল ঢাকার রাস্তায় দোর্দন্ড প্রতাপে চলা “৩ নম্বর মিনিবাস”, হত্যা, হয়রানি আর বেপড়য়া চালচলনের জন্যে সে সর্বজন পরিচিত। সত্যিকথা বলতে কী আমরা একটু ভয়ই পেয়েছিলাম, কেননা আমাদের অনেকের সাথে আমাদের পরিবারের সদস্যরাও আমাদের সংগী হয়েছিলেন। আমাদের সবার মনের অবস্থা উপলব্ধী করতে পেরে সোফা ভাই একটা ছোট-খাটো “ভয় তাড়ানো” বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন; লাভের লাভ হ’ল আমরা আরো বেশী ভীত হয়ে পড়লাম। যাই হোক, মন যখন স্থীর করেছি, তখন আর পিছপা হওয়া চলে না। আল্লহ-র নামে সবাই উঠে পড়লাম। একনম্বর যাত্রী তিননম্বর বাস, শুরু হ’ল যাত্রা। ছুটির সকাল, রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা, তিননম্বর ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। আমরা সবাই গল্পে মত্ত আর সবার হাতে প্রাতঃরাশ ভর্তি ছোট্ট একাটা ঠোঙ্গা (packet)। হঠাত্ তীব্র একটা ঝাকুঁনি, থেমে গেল আমাদের তিননম্বর। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক মুর্তিমান ট্রাফিক কর্মকর্তা। আমাদের সবার মনের মধ্যে আবারও কাল মেঘেরা ভিড় করে এলো। এই বুঝি যাত্রার সমাপ্তি হয়, বাড়ী ফিরে যেতে হয় সবাইকে! আমাদের দেশের আইন-রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব-ই দূঃখজনক এবং তিক্ত। আমরা সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের অপরাধ গুরুতর। আমাদের গাড়ীটির ঢাকার বাহিরে যাবার ছাড়পত্র (license)ছিল না। কিন্তু এবারো দেবদূতের মত সামলে দিলেন আমাদের দৈনিক আজাদ ভাই। দর কষাকষি চললো কিছুক্ষন, তারপর ৫০০ টাকায় দফারফা। এরপর আমরা আবার ছুটতে শুরু করলাম।“ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়”, বাকী যাত্রায় সোফা ভাইকে দেখে বারে বারে আমার এই কথাটিই মনে পড়ছিল, কেননা যতবার উনি গাড়ীর জানালা দিয়ে কোন ট্রাফিক ভাইকে দেখছিলেন, ততবারই ওনার মুখ-চোখ শুকিয়ে যাচ্ছিল।
অবশেষে সব বাধা পেড়িয়ে বেলা বার’টা নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে, মেঘনার পারে। হল্লা ক’রে সবাই নেমে এলাম গাড়ী থেকে, কেউ কেউ আনন্দে আত্বহারা। আমি হলফ করে বলতে পারি, যারা অহরহ বেড়াতে যান, তাদের কাছে মেঘনার পারে বেড়াতে গিয়ে আনন্দে আত্বহারা হ’য়ে যাওয়া আদিক্ষেতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অন্য সবার কথা জানিনা, কিন্তু আমার কাছে এই মেঘনার পারে বেড়াতে আসার ব্যাপারটি ছিল অপার আনন্দের। এমনিতেই নদীর পারে খুব বাতাস বয়, সেদিন যেন একটু বেশী জোরেই বৈ ছিল। হতে পারে এভাবেই নদী নতূণ অতিথীদের তার পারে অভ্যর্থণা জানায়। মেঘনার যে পারে আমরা গিয়েছিলাম সেটা ছিল “মেঘনা সেতু”-র একদম-ই কাছে। সম্ভবত সেতুর প্রয়োজনেই এই পারটি বড় বড় পাথর দিয়ে বাঁধানো। সেই বড় বড় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার পালা, সুন্দরকে ফ্রেমে বন্ধি করার খেলা। সবার সাথে আমিও খেললাম; বসে, দাঁড়িয়ে, পাথরকে জড়িয়ে ধরে অনেক ভাবে ছবি তুললাম এবং একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। অনেক্ষন ধরে সোফা ভাই-কে দেখা যাচ্ছে না। একটু দূরে নির্জনে তাকে পেলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুমপাণ করছেন আর মুগ্ধ চোখে “মেঘনা”-র দিকে তাকিয়ে আছেন। সোফা ভাই “মেঘনা”-র প্রেমে পড়ে গেলেন না-কি? জুমি ভাবীর (ওনার স্ত্রী) জন্যে আমার মন খারপ হল। দৌড়ে ওনার কাছে এলাম, আমাকে দেখে সোফা ভাই বাস্তবে ফিরে এলেন। আমার দিকে একটা তামাকদন্ড (cigarette) বাড়িয়ে দিয়ে নিজের মনেই ব’লে উঠলেন, “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিষির বিন্দু”; তারপর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস। বুঝলাম উনি “মেঘনা”-র প্রেমে পড়েননি, পড়েছেন মেঘনা নদীর প্রেমে। আমিও আশ্বস্ত হলাম।
একাকীত্ব ছেড়ে দুজনেই ফিরে এলাম ছবি তোলায় ব্যাস্ত সংগীদের কাছে। সংগীদের মাঝে একটা কোলাহল শুনতে পেলাম “নৌকায় চড়বো”, “নৌকায় চড়বো”। সবাই নৌকায় চড়বার বায়না ধরেছে। এটা আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না, তাই এই খাতে কোন অর্থও বরাদ্ধ নেই। অন্যদিকে, আমাদের অধিকাংশই সাঁতার জানতাম না (আমিও তাদের মধ্যে একজন)। কিন্তু নদীর বুকে ছোট-বড় নৌকাগুলো কে ভাসতে দেখে, নৌকা ভ্রমনের ইচ্ছাটা সম্বরণ করা সত্যিই কষ্টকর হয়ে দাড়ালো। শেষ অবধি ইচ্ছারই জয় হ’ল। যন্ত্রচালিত একাট মাঝাড়ি আকারের বজরা ভাড়া করা হ’ল। সবাই মিলে সেই বজরায় চরে বসলাম। কেউ বসলো ছাতে, কেউ বসলো পাটাতনে। আনন্দে উদ্বেল হয়ে আমরা হাওয়া খেতে লাগলাম আর যতদুর চোখ যায় দেখতে লাগলাম। কাছাকাছি একটা চর দেখতে পেয়ে, ঠিক হ’ল চরে নামা হবে। এই ফাঁকে আপনাদের একটা মজার তথ্য দিয়ে রাখি। সোফা ভাই সাঁতার জানতেন না আর তাই নৌকা ভ্রমনের ব্যাপারে কিছুটা গররাজী ছিলেন। কিন্তু বজরা ভাড়া করার পরে উনি উঠে বসলেন বজরার ছাতে। শুধু তাই নয়, আমাদের সেই বিদেশীনি ভ্রমন সংগীকেও তার সাথে ছাতে উঠে বসবার জন্যে উদবুদ্ধ করে ফেললেন। তারপর আর কী, সেই ছোট চোখের বিদেশীনির সাথে ওনার গল্পের ঝুড়ি (শতভাগ গল্পই ঢাঁহা মিথ্যা)খুলে বসলেন আর বজরার পাটাতনে ব’সে তার ছোট নাকের স্ত্রী করুণ চোখে তাদের দেখতে লাগলেন। বাস্তব সত্যিই নির্মম! যাই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি। চরে নামার পর, আরেক দফা ছবি পর্ব (Photo session)। ছোট্ট চর, চারিদিকে মেঘনা। তিন-চার ঘর পরিবারের বসবাস এই চরে। ওই সব পরিবারের ছোট ছোট বিবস্ত্র শিশুরা আমাদেরকে বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগল। এরকম অবস্থায় নিজেকে সাধারণত একটু অন্যরকম মনে হয়। মনে হয় “আচ্ছা, আমি তাহলে দেখার মত একটা জিনিস”। আমার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। নিজের অজান্তেই এই বিবস্ত্র শিশুদের বিস্মিত দৃষ্টি নিজেকে একটু বড় ভাবতে সমর্থন জুগিয়েছে। কিন্তু পরক্ষনেই লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে, কেননা আমি তাদের বিস্ময়ের আসল কারনটি বুঝতে পেরেছিলাম। তারা বিস্মিত এই ভেবে যে, এরাও মানুষ, আমারাও মানুষ; এরাও বাংলাদেশী, আমারাও বাংলাদেশী; এরাও বাংলায় কথা বলে, আমারাও বাংলায় কথা বলি। তাহলে এদের গায়ে এত রঙ্গীণ পোশাক আরে আমরা বিবস্ত্র কেন? এর উত্তর আমার জানা নেই অথবা জেনেও না জানার ভান করছি। তবে একথা সত্যি যে চরের বাকী সময়টুকু আমি ঐ শিশুদের চোখে চোখ রাখতে পারিনি। এ লজ্জা আমার একার নয়, আমরা যারা সৌভাগ্যবান, ভাল খাই, ভাল পরিধান করি তাদের সবার।
মনে কষ্ট আর এক পেট ক্ষুধা নিয়ে আবার বজরায় চরে বসলাম। একসময় আমাদের বজরা পারে ভিড়ল, আমরাও নেমে পরলাম। সেতুর নীচেই সরাকারি ব্যাবস্থাপনায় সুন্দর একাটি উদ্যাণ গড়ে তোলা হয়েছে। সারি সারি গাছ আর মাটিতে নরম সবুজ ঘাস, একটা মনোরম ব্যাবস্থা। বসবার জন্যে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই সংগে করে বিছানার চাদর নিয়ে এসেছিলেন। সেই চাদর বিছিয়ে সবাই মিলে সেখানেই খেতে বসে গেলাম। সবার খাবার গতি দেখে ক্ষুদার ঝাঁজ আঁচ করা যাচ্ছিল। দুপুরের খাদ্য তালিকায় ছিল মোরগ পোলাও, সব্জি আর কোমল পানীয়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খাবার গুলো ঠান্ডা হয়ে বিস্বাদ লাগছিল, তারপরেও সবাই খাচ্ছিলাম বুভূক্ষের মত। আমাদের এক বয়োজেষ্ঠ সহকর্মী, মেরুন আপা খাচ্ছিলেন বাঁ হাত দিয়ে কেননা ওনার ডান হাতের আঙ্গুলে পটি (Bandage) বাঁধা। আমাদের বাঁ হাত যেহেতু একাটা বিশেষ কাজের জন্যে সংরক্ষিত থাকে, তাই সবাই একটু অস্বস্থি নিয়ে আড়চোখে ওনার খাওয়া দেখছিলেন। এরমাঝেই উনি একটা সর্বনাশ করে ফেললেন। নিজের ভাগের এক টুকরো মুরগীর মাংস ওনার সেই “বাঁ হাত” দিয়ে তুলে দিলেন সোফা ভাইয়ের প্লেটে। মূহুর্তের জন্যে সবার খাওয়া থেমে গেল। সবার দৃষ্টি সোফা ভাইয়ের পাতে। বেচারা সোফা ভাই, “না পারি সইতে, না পারি কৈতে” অবস্থা। একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন, একবার ওর দিকে তাকাচ্ছেন। এক সময় নিঠুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলেন।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গেল খুব দ্রুত। এরপর কেউ কেউ আলস্যে শরীর এলিয়ে দিলেন মাটিতে পাতা চাদরে আর কেউ চলে গেলেন মেঘনা সেতু দেখতে। সেতুর উপর আরেক দফা ছবি তোলা চলল। এবার ফেরার পালা। সবাই আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম। দৈনিক আজাদ ভাই জানালেন ফিরতি পথে পাহারের টিলায় একটা সুটিং স্পট আছে, চাইলে ঘুরে যেতে পারি। সবাই রাজী “কেয়া কারেগা কাজী”। দৈনিক আজাদ ভাইয়ের নির্দেশে এক জায়গায় এসে গারী থামল, আমার নেমে পরলাম। এখান থেকে শুটিং স্পটের দূরত্ব হাঁটা পথ। কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছে গেলাম। কিন্তু ছুটির দিন, তাই শুটিং স্পটের (Shooting spot) প্রধান ফটকে তালা। তারপরও আমাদের ভেতরে ঢোকার সৌভাগ্য হয়েছিল, তবে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, সে গল্প আরেক দিন করা যাবে। স্পট দেখে ফের গাড়ীতে উঠে বসলাম। আকাশে মেঘ করেছে, ঠান্ডা বাতাস বইছে। দু’পাশে সারি সারি টিলা, আমাদের তিন নম্বর ছুটে চলেছে ফিরতি পথে। ঘন্টাখানিক পরে চা পানের জন্যে আবার যাত্রা বিরতি হ’ল। চা পর্ব অর্থায়ন করলেন দৈনিক আজাদ ভাই। সবাই যখন চা পানে ব্যস্ত, হটাত খেয়াল হ’ল আমাদের একজন সহর্কমী, লাক্ষা বেগম, চা পর্বে অনূপস্থিত। আমরা ক’জন ছুটে গেলাম তার খোঁজে, তাকে পাওয়া গেল গাড়ীতে। এতক্ষন দেখছিলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, এখন দেখি গাড়ী ভেতরেও বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাত লাক্ষা বেগম কাঁদছেন। কান্নার কী কারণ? দয়া করে কেউ হাসবেন না, কান্নার কারণ “স্বামীর লাইগ্যা মন পুড়তাছে”। প্রসঙ্গত, ওনার স্বামী এই ভ্রমনে অংশগ্রহন করতে পারেননি।
লাক্ষা বেগমের দুঃখে দুঃখিত হ’য়ে আমাদের চা পর্ব সংক্ষিপ্ত ক’রে আমরা ফের রওনা হ’য়ে গেলাম ঢাকার পথে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের তিন নম্বর আমাদেরকে নিরাপদে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিয়ে গেল। এরপর সবাইকে আল্লহ হাফেয জানিয়ে, মেঘনার পারকে পেছনে ফেলে যার যার মত রওনা হয়ে গেলাম বাড়ীর পথে। কিন্তু আমার কেন জানি বার বার-ই মনে হচ্ছিল, কে যেন আমার পেছন পেছন আসছে, মেঘনা না তো? আমার কানে কানে যেন কিছু বলছে। বোঝা যাচ্ছে না, খুব অস্পষ্ট। কেমন যেন কবিতার মত শোনাচ্ছে........................
আবার এসো আমার পারে,
ভালবাসা দেব ধারে।
বাতাস নিও বুক ভ’রে,
রেখে যেও ঋণী ক’রে।
কাটবে দিন তোমার আশায়,
জরালে এ কোন অপার মায়ায়।
আবার এসো আমার পারে,
ভালবাসা দেব ধারে।
বাতাস নিও বুক ভ’রে,
রেখে যেও ঋণী ক’রে।
কাটবে দিন তোমার আশায়,
জরালে এ কোন অপার মায়ায়।
আবার এসো আমার পারে,
ভালবাসা দেব ধারে।
কৃতজ্ঞতাঃ সকল ভ্রমনসঙ্গীকে আমারা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। যারা এই বেড়ানোতে অংশগ্রহন করেছিলেন তারা হলেনঃ ভুভাই, সাদুক ভাই, দিলরু আপা এবং তার ছেলে, সালাহ ভাই এবং তার পরিবার, আতকু এবং তার পরিবার, কবুর, মস্তু, হোসনু, সোম্মা, তামান্নু, লিনু, মর্জিনা সুলতানা, সোফা, জুমি, দৈনিক আজাদ ভাই, ইউনহা, লাক্ষা বেগম (সবই ছদ্দনাম)।
No comments:
Post a Comment